পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির মধ্যে অন্যতম সভ্যতা হল সিন্ধুসভ্যতা যা ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতার একটি নিদর্শনস্বরূপ। আনুমানিক ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিন্ধু নদ অঞ্চলে এই সভ্যতাটি গড়ে উঠেছিল বলে সভ্যতাটির নাম রাখা হয় সিন্ধু সভ্যতা। এই সভ্যতাকে অনেকে হরপ্পা সভ্যতা হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ ছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ বেলুচিস্তানে সিন্ধু সভ্যতার অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।
হরপ্পার নগর পরিকল্পনা: হরপ্পা সভ্যতা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নগরায়িত
সভ্যতা। হরপ্পা সভ্যতার প্রধান শহরগুলি হল-হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, লোথাল, কালিবঙ্গাল প্রভৃতি। হরপ্পার প্রতিটি শহরের নগর পরিকল্পনা ছিল একই রকম। হরপ্পার নগর পরিকল্পনা নিম্নে আলোচনা করা হল।
(১) দুর্গনগরী: হরপ্পা সভ্যতার প্রধান শহরগুলি ছিল আয়তাকার। প্রতিটি শহরের পশ্চিমভাগে একটি উঁচু এলাকায় ছিল দুর্গ। এটি সম্ভবত ছিল সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষের আবাসস্থল। প্রাচীর ঘেরা এইসব দুর্গের মধ্যেই থাকত প্রশাসনিক ও ধর্মীয় ভবনগুলি। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর দুর্গ ছিল ইটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। কালিবঙ্গানে দুর্গ ও শহর দুটিই ছিল পাঁচিল ঘেরা। দুর্গের নিচে ছিল শহরের মূল এলাকা। এটি ছিল সাধারণ মানুষের আবাসস্থল। এই অংশ দাবার বোর্ডের মতো ওয়ার্ডে বিভক্ত ছিল।
(২) রাস্তা: সিন্ধু সভ্যতার বিশেষ করে মহেঞ্জোদারো ও কালিবঙ্গানের প্রধান সড়কগুলি ছিল প্রশস্ত। রাস্তাগুলি ৯ থেকে ৩৪ ফুট পর্যন্ত চওড়া। অন্যান্য রাস্তাগুলি প্রধান রাস্তার সঙ্গে সমকোণে প্রসারিত ছিল। রাস্তার পাশে সমান দূরত্বে ল্যাম্পপোষ্টও স্থাপন করা হয়েছিল।
(৩) গৃহনির্মাণ: নগরের বেশিরভাগ বাড়ি পোড়া ইট দিয়ে নির্মিত ছিল, বিশেষ করে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে। তবে লোথাল ও কালিবঙ্গানে রোদে পোড়ানো ইটের বাড়ি পাওয়া গেছে। প্রত্যেকটি বাড়ি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। বেশিরভাগ বাড়ি দু'কক্ষ বিশিষ্ট হলেও বেশি কক্ষবিশিষ্ট বাড়িও ছিল। সেই সময় মানুষ একতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত বাড়িতে বসবাস করত। বাড়ির দরজা ও জানালা ছিল গলিপথের দিকে, বড় রাস্তার দিকে নয়।
(৪) জল নিকাশী ব্যবস্থা: মহেঞ্জোদারো ও ও হ হরপ্পার জল নিকাশী ব্যবস্থা ছিল এককথায় অপূর্ব। প্রতিটি রাস্তায় এমনকি বেশিরভাগ গলিতেই ১-২ ফুট গভীর নর্দমা ছিল। নর্দমার মাঝে মাঝে ম্যানহোল থাকত। সেখানে জলবাহিত আবর্জনা জমা হত এবং পরে তা পরিষ্কার করা হত। বাড়ির স্নানাগারগুলির সাথে রাস্তার নর্দমার সংযোগ ছিল।
(৫) নাগরিক স্বাস্থ্য: নাগরিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক গোপনীয়তার জন্য প্রতিটি বাড়িতেই কুয়া ও শৌচাগারের ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি বাড়িতেই যেমন ময়লা ফেলার পাত্র ছিল, তেমনি রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে জঞ্জাল ফেলার ঝুড়িও বসানো থাকত। সেই সঙ্গে সাধারণের মধ্যে পানীয় জল সরবরাহের জন্য নগরের নানাস্থানে কুয়া খনন করা ছিল।
(৬) বৃহৎ হল: মহেঞ্জোদারোয় ৮০ ফুট আয়তনের একটি বৃহৎ হল আবিষ্কৃত হয়েছে। হলঘরের ভেতরে সারি সারি বসার জায়গা এবং এর সামনে প্ল্যাটফর্ম ' ছিল। এটাকে মহেঞ্জোদারোর সভাগৃহও বলা হয়ে থাকে।
(৭) বৃহৎ স্নানাগার: মহেঞ্জোদারে শহরের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকীর্তি হল দুর্গ এলাকায় বৃহৎ স্নানাগার। ১৮০ ফুট দীর্ঘ ও ১০৮ ফুট প্রশস্ত বিশিষ্ট আয়তনের এই বৃহৎ স্নানাগরের কেন্দ্রস্থলে সাঁতার কাটার উপযোগী ৩৯ ফুট লম্বা ২৩ ফুট চণ্ড ও ৮ ফুট গভীর একটি জলাধার বা চৌবাচ্চা ছিল। এটি সংযুক্ত ছিল একটি কুয়ো সঙ্গে। ব্যবহহৃত দুষিত জল ড্রেনের মাধ্যমে বার করে দেবার ব্যবস্থা ছিল। স্নানাগারে চারপাশে ছিল বারান্দা এবং বারান্দার পেছনে তিনদিকে ছিল কক্ষ ও গ্যালারি কেউ কেউ মনে করেন ধর্মীয় উদ্দেশ্যে স্নানাগারটি নির্মিত হয়েছিল।
(৮) শস্যাগার: হরপ্পার কেন্দ্রস্থলে ৫১.৫১ x ৪১.১৪ মিটার দীর্ঘ এক বিশায় শস্যাগার আবিষ্কৃত হয়েছে। শস্যগারটি দুটি ব্লকে বিভক্ত, ব্লকদুটির মাঝখানে। মিটার লম্বা এক বারান্দা। প্রতিটি ব্লকে ৬টি করে হলঘর। হলঘরগুলিতে শস্য ভরাখা হত। মহেঞ্জোদারোতেও একটি বড় শস্যাগার আবিষ্কৃত হয়েছে। এ শস্যাগারগুলি তৎকালীন রাজকীয় কোষাগার হিসাবে কাজ করত। প্রজাদের কাছ থেকে কর বাবদ আদায়ীকৃত শস্যের দ্বারা শস্যভাণ্ডার পূর্ণ করা হত।
মূল্যায়ন: সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনার গঠন শৈলী দেখে সহজেই অনুধাক করা যায় এই সভ্যতার মানুষেরা গ্রামীণ জীবন পরিত্যাগ করে পরিকল্পিত নগর গছে তুলেছিল এবং সিন্ধু সভ্যতা ছিল তার সমকালীন মানব সভ্যতার একটি উন্নত সভ্যতা আধুনিক নগর পরিকল্পনার ধারণা মূলত সিন্ধু সভ্যতা থেকেই প্রাপ্ত।
হরপ্পা সভ্যতার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর অগে ভারতে প্রথম সভ্যতার উদা হয়। এই সভ্যতার উদয় হয়েছিল সিন্ধু উপত্যকা ও অন্যান্য কয়েকটি অঞ্চলে। এ সভ্যতা সুপ্রাচীন চৈনিক, মিশরীয় ও সুমেরীয় সভ্যতার সমসাময়িক। ইতিহাসে এই সভ্যতা হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতা নামে পরিচিত। খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত তথ্যাবলী বিশ্লেষণ করে হরপ্পা সভ্যতার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি জানা যায়।
(১) নগর পরিকল্পনা: হরপ্পা সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল তার নগর পরিকল্পনা। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, চানহুদাড়ো, লোথাল, কালিবঙ্গান ও বানাওয়ালীর মতো উন্নত মানের নগরগুলি এই পর্বেই গড়ে উঠেছিল। নগরগুলির গঠন ও বিন্যাস দেখে মনে হয় নগর পরিকল্পনা তখন পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রাথমিক স্তরে ছিল না, অনেক উন্নতমানের ছিল। শহরগুলির মধ্যে প্রধান ছল মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা।
(২) নদীমাতৃক: হরপ্পা সভ্যতাটি ছিল নদীমাতৃক। হরপ্পা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদের উপত্যকায় ইরাবতীর তীরে আর মহেঞ্জোদারো সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদের তীরে। হরপ্পা সভ্যতা নদীমাতৃক হবার মূল কারণ ছিল নদী সারা বছর 'ধরে জলের প্রয়োজন মেটায়। তাছাড়া নদী কৃষি ও বাণিজ্যিক পক্ষে সহায়ক। ◆(৩) তাম্র ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা হল তাম্র ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা। হরপ্পা সভ্যতা হল এমন এক যুগের সভ্যতা, যখন বিভিন্ন হাতিয়ার বা জিনিসপত্র তৈরির কাজে পাথরের পরিবর্তে তামা ও ব্রোঞ্জের ব্যবহার করা হয়েছে।
(৪) কৃষি: হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। নদীর জল ও ভূগর্ভস্থ জল কৃষিকাজে ব্যবহার করা হত। এই সময় গম, জোয়ার, বাজরা, তুলা প্রভৃতি চাষ হত। চাষের কাজে ব্যবহৃত হত ষাঁড়।
(৫) পশুপালন: কৃষির ন্যায় পশপালনও বহু মানুষের জীবিকা ছিল। খাদ্যের প্রয়োজনে পালিত পশুর মধ্যে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস মুরগী ইত্যাদি ছিল। পরিবহনের জন্য পোষ মানানো হয়েছিল গাধা, উট, হাতি, বলদ ইত্যাদি পশুকে। শখ করে মানুষ বিড়াল, কুকুর ও বিভিন্ন পাখি পুষত।
(৬) শিল্পকর্ম: জীবন ধারণের প্রয়োজনে বিভিন্ন শিল্পী ও কারিগর সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব হরপ্পা সমাজে ছিল। শিল্পকে কেন্দ্র করে বিশেষজ্ঞ শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল। যেমন-মৃৎশিল্পী, চর্মকার, স্বর্ণকার, রাজমিস্ত্রী প্রভৃতি। ঝিনুকের মালা ও নৌকা নির্মাণ শিল্পী প্রমুখ অর্থনীতিতে নিজ নিজ প্রাধান্য স্থাপন করেছিল। টেরাকোটা শিল্পের আদলে বহু নগ্ন নারীমূর্তি এই যুগের শিল্পীরা তৈরি করেছিল।
(৭) ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি: হরপ্পার অধিবাসীরা বিভিন্ন দ্রব্যাদির ওজন পরিমাপ করার জন্য পাথরের তৈরি বাটখারা ব্যবহার করত। ছোট বাটখারাগুলির আকৃতি ছিল চারকোণাকার এবং বড়গুলি ছিল গোলাকার ও কিছুটা কৌণিক।
(৮) ব্যবসা বাণিজ্য: হরপ্পার অধিবাসীরা ব্যবসা বাণিজ্যে দক্ষ ছিল। জলপথ ও স্থলপথে আভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলত। হরপ্পার বণিকদের সঙ্গে মিশর, সুমের, পারস্য, আফগানিস্তান, রাজস্থান, মহীশূর প্রভৃতি স্থানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। লোথাল বন্দর থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলত। মুদ্রার অভাবে মূলতঃ পণ্য বিনিময়ের দ্বারাই বাণিজ্য হত।
(৯) সমাজে শ্রেণি বৈষম্য: হরপ্পা সমাজে পুরোহিত, বণিক, কারিগর, যোদ্ধা ও ক্রীতদাস সম্প্রদায়ের প্রাধান্য ছিল। ক্রীতদাসের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম ছিল।
(১০) খাদ্য: সিন্ধুর অধিবাসীরা নিরামিষ ও আমিষ উভয়প্রকার খাদ্য গ্রহণ করত। তাদের খাদ্য তালিকায় ছিল গম, যব, খেজুর, চাল, ফলমূল, দুধ, মাছ, মাংস প্রভৃতি।
(১১) পোষাক ও অলংকার সিন্ধুর অধিবাসীরা সুতি ও পশম দুরকম বস্ত্রের ব্যবহার জানত। নারীরা দু'খণ্ড বস্ত্র ব্যবহার করত। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ে অলংকার পরত। হার, বালা, বাজু, আংটি, নোলক, নূপুর প্রভৃতি ছিল প্রিয় অলংকার। ◆(১২) আমোদ প্রমোদ সিন্ধুবাসীরা অবসর সময়ে আমোদ প্রমোদের অহ হিসাবে নাচ ও গানকে প্রাধান্য দিলেও পশু শিকার, মাছধরা, পাশাখেলা, খাঁড়ের লড়াই ইত্যাদিও আমোদ প্রমোদের অঙ্গ ছিল।
(১৩) ধর্মবিশ্বাস: সিন্ধুবাসীরা মাতৃরূপিণী শক্তিপূজা, ধরিত্রীপূজা, লিঙ্গপূজা, যোগীরাজ পশুপতি শিবের পূজা করত। সিন্ধুবাসীরা সূর্যপূজার প্রতীক হিসাবে 'স্বস্তিক' চিহ্ন ব্যবহার করত। অশুভ শক্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য মাদুলি ব্যবহার করত।
মূল্যায়ন: সিন্ধুবাসীদের যে সাংস্কৃতিক দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে সিন্ধু সভ্যতাকে মিশর ও সুমেরীয় সভ্যতার চেয়ে উন্নত বলা যায়। তবে সিন্ধুসভ্যতা উদার ছিল না, রক্ষণশীল ছিল। তাই মেসোপটেমীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও সেখানকার সংস্কৃতি সিন্ধুবাসীদের প্রভাবিত করতে পারেনি।
সিন্ধু বা হরপ্পার পতনের বা অবক্ষয়ের সম্ভাব্য কারণগুলি লেখো।
সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের উপর ভিত্তি করে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অনুমান, হরপ্পা সভ্যতা আনুমানিক ২৩০০ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের মধ্যে গড়ে উঠেছিল। হরপ্পা সভ্যতা ছিল এক বিশাল প্রাণবন্ত সভ্যতা। ঐতিহাসিক দলিলের অভাব থাকায় এই প্রাণবন্ত হরপ্পা সভ্যতা কি কারণে ধ্বংস হয়েছিল সে ব্যাপারে পণ্ডিতদের মধ্যে বির্তক আছে।
হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণগুলিকে
মোটামুটিভাবে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা- (ক) প্রাকৃতিক কারণ (খ) আভ্যন্তরীণ কারণ (গ) অন্যান্য কারণ।
(ক) প্রাকৃতিক কারণ হরপ্পা সভ্যতার পতনের জন্য অনেকে নিম্নলিখিত প্রাকৃতিক কারণগুলিকে দায়ী করে থাকেন।
(১) জলবায়ু পরিবর্তন : সিন্ধু উপত্যকায় একসময় প্রচুর বৃষ্টিপাত হত এবং অঞ্চলটি বনজঙ্গলে ভরা ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এখানে নগরসভ্যতার প্রসারের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করতে প্রচুর ইটের প্রয়োজন হয়। ইট পোড়াতে প্রচুর গাছপালা কাটতে হয়। এর ফলে সিন্ধু উপত্যকায় এক সময় বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং জলবায়ু মানুষের বসবাসের প্রতিকূল হয়ে পড়ে।
(২) মরুভূমির বিস্তার: দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির কারণে ভূগর্ভস্থ লবণ ওপরে উঠে এসে সিন্ধু উপত্যকায় ক্রমে মরুভূমির প্রসার ঘটে। আবার রাজস্থানের থর মরুভূমিতে ক্রমে সিন্ধু উপত্যকার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। ফলে মানুষ ও গৃহপালিত পশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য ও উদ্ভিজ্জ সামগ্রীর উৎপাদন ব্যাহত হয়। সিন্ধু উপত্যকা মনুষ্য বাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে সিন্ধু উপত্যকায় গড়ে ওঠা হরপ্পা সভ্যতার পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
(৩) ভূমিকম্প: খননকার্যের ফলে সিন্ধু উপত্যকায় হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের সাতটি স্তর পাওয়া গেছে। সম্প্রতি আরো দুটি স্তর আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ধ্বংসের পর মানুষ পুনরায় শহর বা নগর গড়ে তুলেছিল। এইসব দেখে অনুমান করা হয় যে সিন্ধু উপত্যকায় বার বার ভূমিকম্পের ফলে হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে।
(৪) প্লাবন হরপ্পা সভ্যতায়: যে উন্নত জল নিকাশী ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল তার ফলে শহরের সমস্ত ময়লা জল ও আবর্জনা সিন্ধু নদীতে এসে পড়ত। ফলে সিন্ধু ও তার শাখা নদীগুলি ক্রমশ নাব্যতা হারিয়ে ফেলে। কারণ নদীর তলদেশে পলি ও আবর্জনা জমে অগভীর হয়ে পড়েছিল। বর্ষা বা অন্য কোনোভাবে জলোচ্ছ্বাস হলে প্রায়শই নদীর দুকূল প্লাবিত হত। এই প্লাবন হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটায়।
(খ) আভ্যন্তরীন কারণ :হরপ্পা সভ্যতার পতনের জন্য অনেকে নিম্নলিখিত আভ্যন্তরীণ কারণগুলিকে দায়ী করে থাকেন।
(১) নাগরিক জীবনের অবক্ষয়: হরপ্পার নাগরিক জীবন প্রথম দিকে উন্নতমানের হলেও পরবর্তীকালে নাগরিক জীবনের অবক্ষয় শুরু হয়। বৃহৎ অট্টালিকা সমূহের স্থান অধিকার করেছিল পুরনো ইটের তৈরি ছোট বাড়ি। এই বাড়িগুলি অনেক ক্ষেত্রেই রাস্তার উপরে এসে পড়েছিল। জল সরবরাহ ব্যবস্থা সংস্কারের অভাবে প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিল। বাণিজ্য ও মৃৎশিল্প তার পূর্ব গৌরব হারিয়েছিল। ফলে হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।
(২) রক্ষণশীল মনোভাব: হরপ্পার অধিবাসীরা রক্ষণশীল মানসিকতার জন্য নতুনের সংস্পর্শে এলেও নতুন কিছু শিখতে চায়নি। সুমের ও ব্যবিলনের সঙ্গে যোগাযোগ ও ধাতুবিদ্যায় পারদর্শী হওয়া সত্তেও ভারী অস্ত্র নির্মাণের দিকে লক্ষ্য দেয়নি। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও সেচ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটায়নি। কৃষি ও বহির্বাণিজ্যের সম্প্রসারণের দিকে সেভাবে লক্ষ্য দেয়নি। এই রক্ষণশীল মানসিকতার জন্য হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
(গ) অন্যান্য কারণ: হরপ্পা সভ্যতা পতনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলি হল-
(১) বর্বর সংস্কৃতি: অনগ্রসর অঞ্চলে হরপ্পা সংস্কৃতির প্রসার ঘটলে হরপ্পা সভ্যতায় অনগ্রসর অঞ্চলের বর্বর সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। ফলে হরপ্পা সংস্কৃতি দিনে দিনে জীর্ণ হয়ে পড়েছিল। হরপ্পা সংস্কৃতি ভেঙে পড়ে। ফলে হরপ্পা সভ্যত পতনের দিকে এগিয়ে যায়।
(২) বহিঃশত্রুর আক্রমণ: ব্যাবিলন, মেসোপটেমিয়া বা অ্যাসিরীয় থেকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং মধ্য এশিয়া থেকে আগত আর্যদের সঙ্গে যুদ্ধ বিগ্রহে সিদ্ধ উপত্যকা জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং বহু অধিবাসী সিন্ধু উপত্যকা ত্যাগ করে আরো দক্ষিণ দিকে সরে যায়।
মূল্যায়ন: পরিশেষে বলা যায় যে, কোনো একক কারণে একদিনে হরপ্পা সভ্যতার পতন হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে যেমন এই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল, তেমনিই আবার দীর্ঘদিন ধরে অবক্ষয় ঘটেছিল। হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের পেছনে সঠিক কি কারণ ছিল তা আজও জানা সম্ভব হয়নি।
